নিম্ন রক্তচাপ (Low Blood Pressure) কেন হয়? লক্ষণ, কারণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও করণীয়
নিম্ন রক্তচাপ বা লো ব্লাড প্রেসার (Low Blood Pressure) এমন একটি অবস্থা, যেখানে রক্তচাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকে। অনেকের ক্ষেত্রে এটি কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না। তবে কারও কারও মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, ঝাপসা দেখা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত না পৌঁছানোর মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
নিম্ন রক্তচাপ বিভিন্ন কারণে হতে পারে। যেমন—শরীরে জলশূন্যতা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, হৃদ্রোগ, হরমোনজনিত সমস্যা বা দীর্ঘদিনের কিছু রোগ। কারণ অনুযায়ী চিকিৎসাও ভিন্ন হতে পারে। তাই বারবার রক্তচাপ কমে গেলে এর কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
এই নিবন্ধে নিম্ন রক্তচাপ কী, কেন হয়, কী কী লক্ষণ দেখা যায়, কত ধরনের, কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, কীভাবে নির্ণয় করা হয়, চিকিৎসা, নিম্ন রক্তচাপ হলে কী করবেন ও কী করবেন না, কী খাবেন, কোন খাবার সীমিত রাখবেন, প্রতিরোধের উপায়, সাধারণ ভুল ধারণার সত্যতা এবং প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর সহজ ভাষায় জানতে পারবেন।
সংক্ষেপে জেনে নিন
- নিম্ন রক্তচাপকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে হাইপোটেনশন (Hypotension) বলা হয়।
- সাধারণভাবে ৯০/৬০ mmHg-এর নিচে রক্তচাপ থাকলে তাকে নিম্ন রক্তচাপ ধরা হয়।
- সব মানুষের ক্ষেত্রে নিম্ন রক্তচাপ ক্ষতিকর নয়। অনেকের কোনো লক্ষণই থাকে না।
- মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, অজ্ঞান হওয়া, ঝাপসা দেখা বা বিভ্রান্তি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- নিম্ন রক্তচাপের চিকিৎসা মূলত এর কারণের ওপর নির্ভর করে।
নিম্ন রক্তচাপ (Low Blood Pressure) কী?
নিম্ন রক্তচাপ বা লো ব্লাড প্রেসার (Low Blood Pressure) হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে ধমনির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত রক্তের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে হাইপোটেনশন (Hypotension) বলা হয়।
সাধারণভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রক্তচাপ ৯০/৬০ mmHg-এর নিচে থাকলে তাকে নিম্ন রক্তচাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে শুধু একটি রক্তচাপের মান দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কারও রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবেই কম থাকতে পারে এবং তার কোনো সমস্যা নাও হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে একই মাত্রার রক্তচাপ গুরুতর উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে।
শুধু রক্তচাপের সংখ্যা নয়, এর সঙ্গে কোনো উপসর্গ আছে কি না এবং শরীরের সামগ্রিক অবস্থা কেমন—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তচাপ কীভাবে কাজ করে?
হৃদ্যন্ত্র সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে রক্ত সারা শরীরে পাম্প করে। রক্ত যখন ধমনির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন ধমনির দেয়ালে যে চাপ সৃষ্টি হয়, সেটিই রক্তচাপ।
রক্তচাপ সাধারণত দুটি সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা হয়।
- সিস্টোলিক (Systolic): হৃদ্যন্ত্র সংকুচিত হয়ে রক্ত পাম্প করার সময়ের চাপ।
- ডায়াস্টোলিক (Diastolic): হৃদ্যন্ত্র শিথিল হয়ে পরবর্তী স্পন্দনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময়ের চাপ।
উদাহরণস্বরূপ, যদি কারও রক্তচাপ ১২০/৮০ mmHg হয়, তাহলে ১২০ হলো সিস্টোলিক এবং ৮০ হলো ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ।
রক্তচাপ দিনের বিভিন্ন সময়ে কিছুটা ওঠানামা করা স্বাভাবিক। বিশ্রাম, ব্যায়াম, মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত জল পান করা এবং কিছু ওষুধের কারণে রক্তচাপ সাময়িকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।
নিম্ন রক্তচাপ কেন হয়?
নিম্ন রক্তচাপের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। কখনও এটি সাময়িক হয়, আবার কখনও কোনো অন্তর্নিহিত রোগের কারণে দীর্ঘদিন ধরে থাকতে পারে।
১. শরীরে জলশূন্যতা (Dehydration)
অতিরিক্ত ঘাম, বমি, ডায়রিয়া বা পর্যাপ্ত জল পান না করলে শরীরে তরলের পরিমাণ কমে যায়। ফলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে।
আরও জানতে পড়ুন: প্রতিদিন কতটা জল পান করা উচিত? কম জল পান করলে কী হতে পারে?
২. অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার, প্রসবজনিত জটিলতা বা শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণের কারণে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যেতে পারে।
৩. হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা
হার্ট অ্যাটাক, হৃদ্যন্ত্রের স্পন্দনের সমস্যা, হার্ট ফেইলিউর বা হার্টের ভালভের রোগের কারণে শরীরে পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প হতে না পারলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে।
৪. হরমোনজনিত সমস্যা
থাইরয়েডের সমস্যা, অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির কিছু রোগ বা ডায়াবেটিসের কারণে রক্তচাপ কমে যেতে পারে।
৫. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, ডাইইউরেটিক (Diuretic) এবং কিছু হৃদ্রোগের ওষুধের কারণে নিম্ন রক্তচাপ হতে পারে।
৬. দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা
অনেকক্ষণ একটানা দাঁড়িয়ে থাকলে কিছু মানুষের রক্তচাপ কমে যেতে পারে এবং মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৭. হঠাৎ উঠে দাঁড়ানো
শোয়া বা বসা অবস্থা থেকে দ্রুত উঠে দাঁড়ালে সাময়িকভাবে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। একে অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন (Orthostatic Hypotension) বলা হয়।
যদি বারবার মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা রক্তচাপ খুব কমে যাওয়ার সমস্যা হয়, তাহলে শুধু লবণ বা জল খেয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন না। এর পেছনে গুরুতর কোনো কারণ থাকতে পারে। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
নিম্ন রক্তচাপের কত ধরনের?
কারণ ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নিম্ন রক্তচাপকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।
১. অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন (Orthostatic Hypotension)
শোয়া বা বসা অবস্থা থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে রক্তচাপ কমে যায়। এতে মাথা ঘোরা, ঝাপসা দেখা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
২. পোস্টপ্র্যান্ডিয়াল হাইপোটেনশন (Postprandial Hypotension)
খাওয়ার ১–২ ঘণ্টার মধ্যে কিছু মানুষের রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এটি বয়স্ক ব্যক্তি ও কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
৩. নিউরালি মেডিয়েটেড হাইপোটেনশন (Neurally Mediated Hypotension)
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে মস্তিষ্ক ও হৃদ্যন্ত্রের মধ্যে সংকেতের পরিবর্তনের কারণে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এটি তুলনামূলকভাবে কম বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
৪. শকজনিত নিম্ন রক্তচাপ (Shock)
এটি নিম্ন রক্তচাপের সবচেয়ে গুরুতর ধরন। গুরুতর সংক্রমণ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, তীব্র অ্যালার্জি (Anaphylaxis) বা হৃদ্যন্ত্রের গুরুতর সমস্যার কারণে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছায় না। এটি একটি জরুরি চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা।
শকজনিত নিম্ন রক্তচাপ জীবন-ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। রোগী অচেতন হয়ে গেলে, শ্বাসকষ্ট হলে বা রক্তচাপ অত্যন্ত কমে গেলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন।
নিম্ন রক্তচাপের লক্ষণ
নিম্ন রক্তচাপের লক্ষণ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। অনেকের রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কম থাকে এবং তাদের কোনো সমস্যা হয় না। তবে রক্তচাপ এতটাই কমে যায় যে মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছাতে পারে না, তখন বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
নিম্ন রক্তচাপের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
- মাথা ঘোরা বা হালকা লাগা
- দুর্বলতা বা অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করা
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা অজ্ঞান হওয়ার মতো অনুভূতি
- চোখে ঝাপসা দেখা
- মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা হওয়া
- বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
- ঠান্ডা, ফ্যাকাশে বা ঘামযুক্ত ত্বক
- হৃদ্স্পন্দন দ্রুত বা অনিয়মিত হওয়া
- শ্বাস দ্রুত হওয়া
শুধু একবার মাথা ঘোরা মানেই নিম্ন রক্তচাপ নয়। পর্যাপ্ত জল পান না করা, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা, অতিরিক্ত গরম বা অন্য অনেক কারণেও সাময়িকভাবে মাথা ঘুরতে পারে। লক্ষণ বারবার দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কারা নিম্ন রক্তচাপের বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?
যে কারও নিম্ন রক্তচাপ হতে পারে। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
- বয়স্ক ব্যক্তি
- গর্ভবতী নারী
- ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি
- হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
- পারকিনসন রোগ বা স্নায়ুতন্ত্রের কিছু রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
- যারা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বা ডাইইউরেটিক (Diuretic) সেবন করেন
- যাদের বারবার বমি, ডায়রিয়া বা শরীরে জলশূন্যতা হয়
গর্ভাবস্থার প্রথম ও দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে অনেক নারীর রক্তচাপ কিছুটা কমে যেতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের অংশ হলেও অতিরিক্ত মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া বা অন্য কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
নিম্ন রক্তচাপের কী কী জটিলতা হতে পারে?
সময়মতো কারণ নির্ণয় ও চিকিৎসা না করলে নিম্ন রক্তচাপ থেকে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
১. পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া
মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কারণে পড়ে গিয়ে মাথা, হাত বা শরীরের অন্য অংশে গুরুতর আঘাত লাগতে পারে।
২. মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত না পৌঁছানো
রক্তচাপ অতিরিক্ত কমে গেলে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও রক্ত পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি হতে পারে, ফলে বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
৩. কিডনির ক্ষতি
দীর্ঘ সময় ধরে রক্তচাপ খুব কম থাকলে কিডনিতে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে এবং কিডনির কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কিডনি কীভাবে সুস্থ রাখবেন, কিডনির সমস্যার লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এই নিবন্ধটি দেখুন। কিডনির সমস্যা হলে কী লক্ষণ দেখা যায়? কারণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়
৪. শক (Shock)
নিম্ন রক্তচাপ দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত কম থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও রক্ত পায় না। এর ফলে শক দেখা দিতে পারে, যা দ্রুত চিকিৎসা না করলে প্রাণঘাতী হতে পারে।
রক্তচাপ অত্যন্ত কমে যাওয়ার সঙ্গে যদি অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, বিভ্রান্তি বা ঠান্ডা ও ঘামযুক্ত ত্বক দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন।
কখন অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
মাঝেমধ্যে সাময়িকভাবে রক্তচাপ কিছুটা কমে যাওয়া সব সময় উদ্বেগের বিষয় নয়। তবে নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
- বারবার মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- রক্তচাপ বারবার ৯০/৬০ mmHg-এর নিচে পাওয়া এবং তার সঙ্গে উপসর্গ থাকা
- বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট হওয়া
- অতিরিক্ত দুর্বলতা বা বিভ্রান্তি দেখা দেওয়া
- তীব্র বমি বা ডায়রিয়ার কারণে শরীরে জলশূন্যতা হওয়া
- রক্তক্ষরণের সন্দেহ থাকলে
- গর্ভাবস্থায় বারবার মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়া
নিম্ন রক্তচাপের সঙ্গে যদি রোগী অচেতন হয়ে পড়েন, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বুকে তীব্র ব্যথা হয় বা শকের লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যান বা জরুরি চিকিৎসা নিন।
নিম্ন রক্তচাপ কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
নিম্ন রক্তচাপ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক প্রথমে রোগীর লক্ষণ, পূর্বের রোগের ইতিহাস, ব্যবহৃত ওষুধ এবং শারীরিক পরীক্ষা সম্পর্কে জানেন। এরপর প্রয়োজনে রক্তচাপ মাপা এবং অন্যান্য পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
১. রক্তচাপ পরিমাপ (Blood Pressure Measurement)
রক্তচাপ মাপার মাধ্যমেই প্রথমে বোঝা যায় রক্তচাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কম কি না। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার রক্তচাপ মাপা হয়।
২. অর্থোস্ট্যাটিক রক্তচাপ পরীক্ষা (Orthostatic Blood Pressure Test)
শোয়া, বসা এবং দাঁড়ানো—এই তিন অবস্থায় রক্তচাপ মাপা হয়। হঠাৎ উঠে দাঁড়ানোর পর রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশনের সম্ভাবনা থাকে।
৩. রক্ত পরীক্ষা
রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া), সংক্রমণ, রক্তে শর্করার মাত্রা, কিডনি বা থাইরয়েডের সমস্যা আছে কি না তা মূল্যায়নের জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হতে পারে।
৪. ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG)
হৃদ্যন্ত্রের স্পন্দন বা ছন্দে কোনো সমস্যা আছে কি না তা জানতে ECG করা হয়।
৫. ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echocardiogram)
প্রয়োজনে হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য ইকোকার্ডিওগ্রাম করা হতে পারে।
৬. টিল্ট টেবিল টেস্ট (Tilt Table Test)
বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশনের সন্দেহ থাকলে বিশেষ ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা করা হতে পারে।
শুধু একবার রক্তচাপ কম পাওয়া মানেই নিম্ন রক্তচাপের রোগ হয়েছে—এমন নয়। চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন।
নিম্ন রক্তচাপ হলে কী করবেন? ও কী করবেন না
নিম্ন রক্তচাপ হলে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে কিছু সহজ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে উপসর্গ কমানো সম্ভব। তবে গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নিচে কী করবেন এবং কী করবেন না তা আলাদাভাবে দেওয়া হলো।
যা করবেন
নিম্ন রক্তচাপ হলে কী করবেন, তা মূলত এর কারণ এবং উপসর্গের ওপর নির্ভর করে। যদি মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে পারেন।
- মাথা ঘুরলে সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ুন বা শুয়ে পড়ুন।
- সম্ভব হলে পা দুটি কিছুটা উঁচু করে রাখুন।
- পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করুন, বিশেষ করে শরীরে জলশূন্যতা থাকলে।
- অনেকক্ষণ বসে বা শুয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন।
- বারবার রক্তচাপ কমে গেলে এর কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
অতিরিক্ত গরম পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ থাকলে বা অতিরিক্ত ঘাম হলে পর্যাপ্ত জল পান করুন। এতে জলশূন্যতার কারণে রক্তচাপ কমে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে।
যা করবেন না
- হঠাৎ করে শোয়া বা বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াবেন না।
- মাথা ঘোরার সময় একা গাড়ি চালানো বা যন্ত্রপাতি পরিচালনা করবেন না।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করবেন না।
- দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকবেন না।
- বারবার অজ্ঞান হওয়া বা মাথা ঘোরার সমস্যাকে অবহেলা করবেন না।
- শুধু লবণ বেশি খেলেই সব ধরনের নিম্ন রক্তচাপ ভালো হয়ে যাবে—এমন ধারণা করবেন না।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত লবণ খাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে কিডনির রোগ, হৃদ্রোগ বা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি থাকলে এটি ক্ষতিকর হতে পারে।
নিম্ন রক্তচাপের চিকিৎসা
নিম্ন রক্তচাপের চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে এর কারণের ওপর নির্ভর করে। যাদের কোনো উপসর্গ নেই, তাদের অনেক ক্ষেত্রেই বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে উপসর্গ থাকলে বা কোনো রোগের কারণে রক্তচাপ কমে গেলে সেই কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়।
১. জীবনযাপনের পরিবর্তন
- পর্যাপ্ত জল পান করা
- ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানোর অভ্যাস করা
- অল্প অল্প করে বারবার খাবার খাওয়া
- প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কমপ্রেশন স্টকিংস ব্যবহার করা
২. কারণভিত্তিক চিকিৎসা
অ্যানিমিয়া, ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, হৃদ্রোগ বা অন্য কোনো রোগের কারণে নিম্ন রক্তচাপ হলে সেই রোগের উপযুক্ত চিকিৎসা করা হয়।
৩. ওষুধ
কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে উপসর্গযুক্ত নিম্ন রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসক বিশেষ ধরনের ওষুধ দেওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন। নিজে থেকে কোনো ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
নিম্ন রক্তচাপের জন্য সবার একই চিকিৎসা হয় না। তাই অন্যের পরামর্শে বা ইন্টারনেট দেখে ওষুধ না খেয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করুন।
নিম্ন রক্তচাপ হলে কী খাবেন?
নিম্ন রক্তচাপের ক্ষেত্রে এমন খাবার ও পানীয় গ্রহণ করা উচিত, যা শরীরে পর্যাপ্ত তরল বজায় রাখতে এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। তবে কী খাবেন, তা নিম্ন রক্তচাপের কারণ, বয়স এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে।
যেসব খাবার খেতে পারেন
- পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করুন।
- প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওআরএস (ORS) পান করতে পারেন।
- তাজা ফল ও শাকসবজি খাওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রোটিনযুক্ত খাবার গ্রহণ করুন।
- সারাদিনে অল্প অল্প করে কয়েকবার খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।
- ডায়রিয়া বা বমির কারণে শরীরে জলশূন্যতা হলে দ্রুত তরল ও ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণ করুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ থাকলে পরিমিত পরিমাণে লবণ গ্রহণ করা যেতে পারে।
সব নিম্ন রক্তচাপের রোগীর বেশি লবণ খাওয়ার প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে কিডনির রোগ, হৃদ্রোগ বা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া লবণের পরিমাণ বাড়াবেন না।
যেসব খাবার সীমিত বা এড়িয়ে চলবেন
সব ধরনের খাবার সবার জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলো মেনে চললে উপকার পাওয়া যেতে পারে।
- একবারে অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলুন।
- অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলুন।
- অতিরিক্ত চিনি-সমৃদ্ধ কোমল পানীয় সীমিত রাখুন।
- যেসব খাবার খেলে আপনার মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা বাড়ে, সেগুলো এড়িয়ে চলুন।
নিম্ন রক্তচাপ প্রতিরোধের উপায়
সব ধরনের নিম্ন রক্তচাপ প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস অনুসরণ করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
- দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকবেন না।
- ধীরে ধীরে বসা বা শোয়া অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ান।
- অতিরিক্ত গরম পরিবেশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা এড়িয়ে চলুন।
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করুন।
- নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ শুরু বা বন্ধ করবেন না।
- ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা বা হৃদ্রোগ থাকলে নিয়মিত ফলো-আপ করুন।
যদি আপনার বারবার নিম্ন রক্তচাপের সমস্যা হয়, তাহলে নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন এবং ফলাফল লিখে রাখুন। এতে চিকিৎসকের জন্য কারণ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনা করা সহজ হয়।
সত্য বনাম মিথ
নিম্ন রক্তচাপ সব সময় বিপজ্জনক।
অনেক মানুষের রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কম থাকে এবং তাদের কোনো সমস্যা হয় না। উপসর্গ থাকলে বা রক্তচাপ খুব কমে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
লো ব্লাড প্রেসার হলে বেশি লবণ খেলেই ভালো হয়ে যায়।
সব রোগীর ক্ষেত্রে এটি সঠিক নয়। অতিরিক্ত লবণ অনেকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা উচিত।
একবার রক্তচাপ কম পাওয়া মানেই নিম্ন রক্তচাপের রোগ হয়েছে।
রক্তচাপ সাময়িকভাবে কমতে পারে। বারবার রক্তচাপ কম পাওয়া এবং এর সঙ্গে উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
নিম্ন রক্তচাপের কোনো চিকিৎসা নেই।
নিম্ন রক্তচাপের চিকিৎসা রয়েছে। এর কারণ শনাক্ত করে উপযুক্ত চিকিৎসা ও জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. নিম্ন রক্তচাপ কত হলে ধরা হয়?
সাধারণভাবে ৯০/৬০ mmHg-এর নিচে রক্তচাপ থাকলে তাকে নিম্ন রক্তচাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে উপসর্গ আছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
২. নিম্ন রক্তচাপ কি বিপজ্জনক?
সব সময় নয়। তবে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া, শ্বাসকষ্ট বা বুকে ব্যথার মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. নিম্ন রক্তচাপ হলে কী কফি খাওয়া যায়?
কিছু ক্ষেত্রে ক্যাফেইন সাময়িকভাবে রক্তচাপ বাড়াতে পারে। তবে এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। নিয়মিত কফি পানকে চিকিৎসা হিসেবে ধরা যায় না।
৪. গর্ভাবস্থায় নিম্ন রক্তচাপ হওয়া কি স্বাভাবিক?
গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে অনেক নারীর রক্তচাপ কিছুটা কমে যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৫. নিম্ন রক্তচাপ কি সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়?
যদি এটি সাময়িক কোনো কারণে হয়, তাহলে কারণ দূর হলে রক্তচাপ স্বাভাবিক হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্রে কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
৬. নিম্ন রক্তচাপ হলে কী ব্যায়াম করা যায়?
হ্যাঁ। তবে উপসর্গ থাকলে বা গুরুতর নিম্ন রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম শুরু করা উচিত।
৭. নিম্ন রক্তচাপ কি বংশগত হতে পারে?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পারিবারিক প্রবণতা থাকতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অন্যান্য কারণও ভূমিকা রাখে।
৮. বারবার মাথা ঘোরা মানেই কি নিম্ন রক্তচাপ?
না। মাথা ঘোরার আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৯. নিম্ন রক্তচাপ হলে কখন জরুরি হাসপাতালে যেতে হবে?
অচেতন হয়ে গেলে, শ্বাসকষ্ট, তীব্র বুকে ব্যথা, বিভ্রান্তি বা শকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
১০. নিম্ন রক্তচাপ কি উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ?
সব সময় নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি সাময়িক সমস্যা, আবার কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি রোগ বা অন্য শারীরিক সমস্যার কারণে হতে পারে।
শেষ কথা
নিম্ন রক্তচাপ সব সময় উদ্বেগের কারণ না হলেও, এর সঙ্গে যদি মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া বা অন্য গুরুতর লক্ষণ থাকে, তাহলে অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো কারণ নির্ণয়, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বারবার রক্তচাপ কমে গেলে অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
তথ্যসূত্র
- American Heart Association (AHA) – Low Blood Pressure (Hypotension)
- National Heart, Lung, and Blood Institute (NHLBI) – Low Blood Pressure
- NHS (UK) – Low Blood Pressure (Hypotension)
- Cleveland Clinic – Low Blood Pressure
- MedlinePlus – Low Blood Pressure
দায়বদ্ধতা: এই আর্টিকেলে দেওয়া তথ্য শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য। এটি কোনো চিকিৎসকের বিকল্প নয়।
