ডায়রিয়া হলে কী করবেন? লক্ষণ, কারণ, ORS, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
ডায়রিয়া একটি সাধারণ হজমের সমস্যা, যেখানে স্বাভাবিকের তুলনায় বারবার পাতলা বা জলীয় পায়খানা হয়। বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ, দূষিত খাবার বা জল এবং অপরিচ্ছন্নতার কারণে ডায়রিয়া হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডায়রিয়া কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। তবে অতিরিক্ত জল ও লবণ বেরিয়ে গেলে শরীরে জলশূন্যতা তৈরি হতে পারে, যা কখনও কখনও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
সংক্ষেপে জেনে নিন
- ডায়রিয়া কী? সাধারণভাবে দিনে তিনবার বা তার বেশি পাতলা বা জলীয় পায়খানা হলে তাকে ডায়রিয়া বলা হয়।
- ডায়রিয়া কেন হয়? ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবীর সংক্রমণ, দূষিত খাবার বা জল এবং কিছু অন্যান্য কারণে ডায়রিয়া হতে পারে।
- সাধারণ লক্ষণ: পাতলা বা জলীয় পায়খানা, পেটে ব্যথা বা মোচড়, বমি, জ্বর, দুর্বলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে পায়খানায় রক্ত বা শ্লেষ্মা দেখা দিতে পারে।
- প্রধান ঝুঁকি: বারবার পাতলা পায়খানার ফলে শরীর থেকে জল ও লবণ বেরিয়ে গিয়ে জলশূন্যতা হতে পারে।
- চিকিৎসা: ডায়রিয়ার সময় জল ও লবণের ঘাটতি পূরণে ওআরএস গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনুযায়ী অন্যান্য চিকিৎসারও প্রয়োজন হতে পারে।
- কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন? পায়খানায় রক্ত, গুরুতর জলশূন্যতা, তীব্র দুর্বলতা, বারবার বমি বা দীর্ঘদিন ডায়রিয়া থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- প্রতিরোধ: নিরাপদ জল পান করা, সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধোয়া এবং খাবার পরিষ্কারভাবে তৈরি ও সংরক্ষণ করা ডায়রিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
ডায়রিয়া কী?
ডায়রিয়া হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে স্বাভাবিকের তুলনায় ঘন ঘন পাতলা বা জলীয় পায়খানা হয়। সাধারণভাবে দিনে তিনবার বা তার বেশি এমন পায়খানা হলে তাকে ডায়রিয়া হিসেবে ধরা হয়। তবে একজন ব্যক্তির স্বাভাবিক অভ্যাসের তুলনায় হঠাৎ পায়খানার পরিমাণ ও ঘনত্ব বেড়ে গেলেও সেটি ডায়রিয়ার লক্ষণ হতে পারে।
ডায়রিয়া নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়; এটি বিভিন্ন রোগ বা শারীরিক সমস্যার একটি লক্ষণ। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবীর সংক্রমণ এর সাধারণ কারণ। এছাড়া দূষিত খাবার বা জল, কিছু ওষুধ এবং নির্দিষ্ট কিছু খাবারের প্রতি অসহিষ্ণুতার কারণেও ডায়রিয়া হতে পারে।
ডায়রিয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো জলশূন্যতা। বারবার পাতলা পায়খানা হলে শরীর থেকে জল ও বিভিন্ন লবণ বেরিয়ে যায়। তাই ডায়রিয়া হলে শুধু পায়খানা বন্ধ করার দিকে নজর না দিয়ে শরীরে জল ও লবণের ঘাটতি পূরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়রিয়ার ধরন
ডায়রিয়াকে সাধারণত এর স্থায়িত্ব এবং পায়খানার ধরন অনুযায়ী কয়েকভাবে ভাগ করা যায়।
- তীব্র জলীয় ডায়রিয়া: কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত পাতলা বা জলীয় পায়খানা হতে পারে।
- রক্তযুক্ত ডায়রিয়া: পায়খানার সঙ্গে রক্ত দেখা যেতে পারে। একে আমাশয়ও বলা হয়।
- দীর্ঘস্থায়ী বা পারসিস্টেন্ট ডায়রিয়া: ডায়রিয়া ১৪ দিন বা তার বেশি সময় ধরে চলতে থাকলে তাকে এই ধরনের ডায়রিয়া বলা হয়।
পায়খানায় রক্ত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, খুব বেশি তৃষ্ণা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, চোখ বসে যাওয়া বা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাবের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে জলশূন্যতা দ্রুত গুরুতর হতে পারে।
ডায়রিয়া কেন হয়?
ডায়রিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো অন্ত্রে সংক্রমণ। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবীর সংক্রমণের কারণে অন্ত্রের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হলে পাতলা বা জলীয় পায়খানা হতে পারে। এছাড়া কিছু খাবার, ওষুধ বা হজমের সমস্যার কারণেও ডায়রিয়া হতে পারে।
ডায়রিয়ার প্রধান কারণ
- ভাইরাসের সংক্রমণ: বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস অন্ত্রে সংক্রমণ ঘটিয়ে ডায়রিয়া করতে পারে।
- ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ: কিছু ব্যাকটেরিয়া দূষিত খাবার বা জলের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে ডায়রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
- পরজীবীর সংক্রমণ: Giardia বা Entamoeba-এর মতো কিছু পরজীবী অন্ত্রে সংক্রমণ ঘটিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ডায়রিয়া করতে পারে।
- দূষিত খাবার বা জল: খাবার বা জলে থাকা রোগজীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে অন্ত্রে সংক্রমণ হয়ে ডায়রিয়া হতে পারে।
- কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: বিশেষ করে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর ডায়রিয়া হতে পারে।
- খাদ্য অসহিষ্ণুতা: কিছু নির্দিষ্ট খাবার বা উপাদান শরীর সহ্য করতে না পারলেও ডায়রিয়া হতে পারে।
ডায়রিয়া কীভাবে ছড়ায়?
সংক্রমণজনিত ডায়রিয়ার জীবাণু সাধারণত মল থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। অপরিষ্কার হাত, দূষিত জল, জীবাণুযুক্ত খাবার এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের মাধ্যমে এই জীবাণু ছড়াতে পারে।
- টয়লেট ব্যবহারের পর ভালোভাবে হাত না ধোয়া
- দূষিত বা নিরাপদ নয় এমন জল পান করা
- অপরিষ্কার হাতে খাবার তৈরি বা খাওয়া
- অপরিষ্কার বা জীবাণুযুক্ত খাবার খাওয়া
- অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাস করা
ডায়রিয়া প্রতিরোধে নিরাপদ জল পান করা, খাবার ভালোভাবে রান্না ও সংরক্ষণ করা এবং সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়রিয়ার লক্ষণ কী?
ডায়রিয়ার প্রধান লক্ষণ হলো স্বাভাবিকের তুলনায় ঘন ঘন পায়খানা হওয়া। এর সঙ্গে কারণ অনুযায়ী আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
- বারবার পাতলা বা জলীয় পায়খানা
- পেটে ব্যথা বা মোচড় দেওয়া
- পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি
- বমি বমি ভাব বা বমি
- জ্বর
- দুর্বলতা ও ক্লান্তি
- ক্ষুধা কমে যাওয়া
- কিছু ক্ষেত্রে পায়খানায় রক্ত বা শ্লেষ্মা দেখা দেওয়া
ডায়রিয়ার সঙ্গে বমি বা জ্বর থাকলে শরীর থেকে জল ও লবণ আরও দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে। তাই এই সময় জলশূন্যতার লক্ষণগুলোর দিকেও নজর রাখা জরুরি।
ডায়রিয়ায় জলশূন্যতার লক্ষণ
বারবার পাতলা পায়খানার কারণে শরীর থেকে জল ও বিভিন্ন লবণ বেরিয়ে যায়। এই ঘাটতি পূরণ না হলে জলশূন্যতা হতে পারে। ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে জলশূন্যতাই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা।
- অতিরিক্ত তৃষ্ণা পাওয়া
- মুখ ও জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা অবসাদ
- প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
- চোখ বসে যাওয়া
- মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম করা
- অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব বা দুর্বল হয়ে পড়া
ডায়রিয়ার সঙ্গে খুব বেশি দুর্বলতা, প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, চোখ বসে যাওয়া, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব বা জল পান করতে না পারার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ডায়রিয়ার ঝুঁকির কারণ
যে কেউ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন। তবে কিছু পরিস্থিতিতে ডায়রিয়ার সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
- অপরিষ্কার বা নিরাপদ নয় এমন জল পান করা
- অপরিষ্কার হাতে খাবার তৈরি বা খাওয়া
- দূষিত বা ঠিকভাবে রান্না না করা খাবার খাওয়া
- অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাস করা
- স্যানিটেশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা
- ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত পুষ্টি
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা
- ম্যালেরিয়া বা অন্যান্য সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় ভ্রমণ বা বসবাস করা
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়ার কারণে জলশূন্যতা দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। তাই এদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া হলে বিশেষভাবে নজর রাখা জরুরি।
কখন অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
বেশিরভাগ সাধারণ ডায়রিয়া কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যেতে পারে। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
- পায়খানায় রক্ত দেখা গেলে
- ডায়রিয়া ১৪ দিন বা তার বেশি সময় ধরে চললে
- বারবার বমির কারণে জল বা ওআরএস রাখতে না পারলে
- অতিরিক্ত তৃষ্ণা বা মুখ-জিহ্বা খুব শুকিয়ে গেলে
- প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে
- চোখ বসে যাওয়া বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে
- অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব, বিভ্রান্তি বা সাড়া কমে গেলে
- তীব্র পেটব্যথা বা উচ্চ জ্বর হলে
- শিশুর ক্ষেত্রে বারবার পাতলা পায়খানা বা জলশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে
তীব্র জলশূন্যতা, অচেতন হয়ে যাওয়া, জল বা ওআরএস পান করতে না পারা, খুব কম প্রস্রাব হওয়া কিংবা শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকলে দ্রুত হাসপাতালে যান। গুরুতর জলশূন্যতার ক্ষেত্রে শরীরে দ্রুত জল ও লবণের ঘাটতি পূরণ করতে শিরার মাধ্যমে স্যালাইন বা অন্যান্য তরল দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
ডায়রিয়া কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
সাধারণ ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় শুধু রোগীর লক্ষণ, কতদিন ধরে সমস্যা রয়েছে এবং সাম্প্রতিক খাবার ও জল গ্রহণের ইতিহাস জেনেই চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে কারণ সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন। প্রয়োজনে শারীরিক পরীক্ষা করে জলশূন্যতার মাত্রাও দেখা হয়।
চিকিৎসক যেসব তথ্য জানতে চাইতে পারেন
- দিনে কতবার পাতলা পায়খানা হচ্ছে
- কতদিন ধরে ডায়রিয়া রয়েছে
- পায়খানায় রক্ত বা শ্লেষ্মা আছে কি না
- জ্বর, বমি বা পেটে ব্যথা আছে কি না
- সম্প্রতি কোনো দূষিত খাবার বা জল গ্রহণ করা হয়েছে কি না
- কোনো নতুন ওষুধ, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা হয়েছে কি না
- সাম্প্রতিক ভ্রমণ বা সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ইতিহাস আছে কি না
প্রয়োজনে যেসব পরীক্ষা করা হতে পারে
- পায়খানা পরীক্ষা: পায়খানায় রক্ত, পরজীবী বা নির্দিষ্ট জীবাণুর উপস্থিতি খুঁজে দেখতে করা হতে পারে।
- রক্ত পরীক্ষা: গুরুতর সংক্রমণ বা শরীরে জল ও লবণের ভারসাম্যে সমস্যা হয়েছে কি না, তা বোঝার জন্য চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা দিতে পারেন।
- অন্যান্য পরীক্ষা: ডায়রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চললে বা অন্য কোনো রোগের সন্দেহ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত পরীক্ষা করা হতে পারে।
সব ধরনের ডায়রিয়ার জন্য পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। ডায়রিয়ার স্থায়িত্ব, লক্ষণ, জলশূন্যতার মাত্রা এবং সম্ভাব্য কারণের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।
ডায়রিয়ার চিকিৎসা
ডায়রিয়ার চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া জল ও লবণের ঘাটতি পূরণ করা এবং ডায়রিয়ার কারণ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জলশূন্যতা প্রতিরোধ করাই চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ওআরএস (ORS)
ডায়রিয়ার সময় শরীর থেকে জল ও বিভিন্ন লবণ বেরিয়ে যায়। ওআরএস শরীরে হারিয়ে যাওয়া জল ও ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণ করতে সাহায্য করে। তাই ডায়রিয়া হলে ওআরএস খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ওআরএস প্যাকেটের গায়ে দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ নিরাপদ জল দিয়ে ওআরএস তৈরি করুন। তৈরি করা ওআরএস কতক্ষণ ব্যবহার করা যাবে, সে বিষয়ে প্যাকেটের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
শিশুদের ক্ষেত্রে জিংক
শিশুদের তীব্র ডায়রিয়ায় ওআরএসের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জিংক দেওয়া হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১০–১৪ দিনের জন্য ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের দৈনিক ১০ mg এবং ৬ মাস বা তার বেশি বয়সী শিশুদের দৈনিক ২০ mg জিংক দেওয়ার সুপারিশ করে।
শিশুকে নিজের থেকে জিংক বা অন্য কোনো ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করে দেবেন না। শিশুর বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং ব্যবহৃত জিংক প্রস্তুতির ধরন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
খাবার চালিয়ে যান
ডায়রিয়া হলে খাবার একেবারে বন্ধ করা উচিত নয়। শরীরের শক্তি ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে রোগীর সহনশীলতা অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের ক্ষেত্রে বুকের দুধও চালিয়ে যেতে হবে।
অ্যান্টিবায়োটিক কি সবসময় দরকার?
না। সব ধরনের ডায়রিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না। ডায়রিয়ার কারণ ও রোগীর অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন আছে কি না, তা নির্ধারণ করেন।
বিশেষ করে পায়খানায় রক্ত, গুরুতর সংক্রমণ বা নির্দিষ্ট কিছু সংক্রমণের ক্ষেত্রে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। তাই নিজের থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়।
ডায়রিয়া বন্ধ করার জন্য শুধু ওষুধ খাওয়াই মূল চিকিৎসা নয়। শরীরে জল ও লবণের ঘাটতি পূরণ করা, পর্যাপ্ত পুষ্টি বজায় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডায়রিয়ার কারণের চিকিৎসা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়রিয়া হলে কী করবেন ও কী করবেন না
যা করবেন
- বারবার পাতলা পায়খানা হলে ওআরএস পান করুন।
- পর্যাপ্ত নিরাপদ জল ও অন্যান্য তরল গ্রহণ করুন।
- সহনশীলতা অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার চালিয়ে যান।
- শিশুর ডায়রিয়া হলে বুকের দুধ চালিয়ে যান।
- টয়লেট ব্যবহারের পর এবং খাবার তৈরি বা খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন।
- জলশূন্যতার লক্ষণগুলোর দিকে নজর রাখুন।
- পায়খানায় রক্ত, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া বা গুরুতর জলশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
যা করবেন না
- ডায়রিয়া হলেই নিজের থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না।
- ডায়রিয়া বন্ধ করার ওষুধ নিজের ইচ্ছায় বারবার খাবেন না।
- ডায়রিয়া হয়েছে বলে খাবার একেবারে বন্ধ করবেন না।
- অপরিষ্কার বা নিরাপদ নয় এমন জল পান করবেন না।
- শিশুর ডায়রিয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করবেন না।
- রক্তযুক্ত পায়খানা বা গুরুতর জলশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে শুধু ঘরোয়া যত্নের ওপর নির্ভর করবেন না।
ডায়রিয়ার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জলশূন্যতা প্রতিরোধ করা। ওআরএস গ্রহণের পাশাপাশি রোগীর অবস্থা নজরে রাখুন এবং গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ডায়রিয়ায় কোন খাবার সীমিত বা এড়িয়ে চলবেন?
ডায়রিয়ার সময় সব খাবার বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কিছু খাবার পেটের অস্বস্তি বা পাতলা পায়খানা বাড়াতে পারে। তাই উপসর্গের সময় এসব খাবার সাময়িকভাবে সীমিত রাখা ভালো।
- অতিরিক্ত ঝাল ও মশলাদার খাবার
- অতিরিক্ত তেল বা চর্বিযুক্ত খাবার
- অতিরিক্ত মিষ্টি বা খুব বেশি চিনি রয়েছে এমন খাবার ও পানীয়
- অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়
- অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়
- যে খাবার খেলে আপনার ব্যক্তিগতভাবে পেটের সমস্যা বা ডায়রিয়া বেড়ে যায়
ডায়রিয়া হয়েছে বলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা উচিত নয়। শরীরের শক্তি ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্য সহনশীলতা অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়রিয়া হলে কী খাবেন?
ডায়রিয়ার সময় সহজে হজম হয় এমন পুষ্টিকর খাবার অল্প অল্প করে বারবার খেতে পারেন। খাবারের পাশাপাশি শরীরে জল ও লবণের ঘাটতি পূরণ করাও জরুরি।
- ভাত বা নরম খিচুড়ি
- সেদ্ধ আলু এবং সহজে হজম হয় এমন অন্যান্য খাবার
- কলা
- সেদ্ধ বা ভালোভাবে রান্না করা সবজি
- সুপ বা পাতলা ঝোলজাতীয় খাবার
- সহনশীলতা অনুযায়ী ডিম, মাছ বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার
- শিশু হলে বুকের দুধ চালিয়ে যেতে হবে
খাবারের পাশাপাশি ডায়রিয়ার সময় ওআরএস গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। এটি পায়খানার মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া জল ও লবণের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে।
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি বা জলশূন্যতার লক্ষণ রয়েছে এমন রোগীর ক্ষেত্রে খাবার ও তরল গ্রহণের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ডায়রিয়া প্রতিরোধের উপায়
নিরাপদ জল, পরিচ্ছন্নতা এবং সঠিক খাবার ব্যবস্থাপনা ডায়রিয়া প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- নিরাপদ ও পরিষ্কার জল পান করুন।
- টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।
- খাবার তৈরি ও খাওয়ার আগে হাত পরিষ্কার করুন।
- খাবার ভালোভাবে রান্না করে খান।
- রান্না করা খাবার পরিষ্কারভাবে ঢেকে রাখুন এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করুন।
- কাঁচা ও রান্না করা খাবারের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।
- অপরিষ্কার বা দূষিত জল দিয়ে তৈরি খাবার ও পানীয় এড়িয়ে চলুন।
- বাড়ির আশপাশ ও টয়লেটের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।
- শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী সঠিক পুষ্টি ও বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিন।
ডায়রিয়া নিয়ে সত্য ও ভুল ধারণা
ডায়রিয়া হলে একেবারে না খেয়ে থাকতে হয়।
ডায়রিয়ার সময় খাবার পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে সহনশীলতা অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়রিয়া হলে শুধু জল খেলেই হবে।
ডায়রিয়ার সময় শুধু জল নয়, শরীর থেকে হারিয়ে যাওয়া জল ও লবণের ঘাটতিও পূরণ করা দরকার। এজন্য ওআরএস গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়রিয়া হলেই অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হয়।
সব ধরনের ডায়রিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। ডায়রিয়ার কারণ ও রোগীর অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন।
ডায়রিয়া কয়েক দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে, তাই জলশূন্যতার দিকে নজর দেওয়ার দরকার নেই।
বেশিরভাগ ডায়রিয়া কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যেতে পারে, তবে বারবার পাতলা পায়খানার কারণে দ্রুত জলশূন্যতা হতে পারে। তাই শুরু থেকেই জল ও লবণের ঘাটতি পূরণ করা এবং জলশূন্যতার লক্ষণগুলোর দিকে নজর রাখা জরুরি।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ডায়রিয়া হলে কতদিনে ভালো হয়?
সাধারণ তীব্র ডায়রিয়া অনেক ক্ষেত্রে কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। তবে ডায়রিয়া দীর্ঘদিন চলতে থাকলে বা উপসর্গের তীব্রতা বাড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
২. ডায়রিয়া হলে কি শুধু ওআরএস খেলেই হবে?
ওআরএস শরীরের হারিয়ে যাওয়া জল ও লবণের ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ। তবে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার চালিয়ে যাওয়াও জরুরি। গুরুতর জলশূন্যতা বা অন্য কোনো জটিলতা থাকলে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
৩. ডায়রিয়া হলে কি দুধ খাওয়া বন্ধ করতে হবে?
সব ক্ষেত্রে দুধ বা দুধজাত খাবার বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে দুধ খাওয়ার পর যদি পেটের অস্বস্তি বা ডায়রিয়া বেড়ে যায়, তাহলে সাময়িকভাবে এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
৪. ডায়রিয়ায় কি অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যায়?
সব ধরনের ডায়রিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। ডায়রিয়ার কারণ ও রোগীর অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন আছে কি না, তা নির্ধারণ করেন। তাই নিজের থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়।
৫. ডায়রিয়া হলে কি উপোস করা উচিত?
না। ডায়রিয়া হলে দীর্ঘ সময় উপোস করে থাকা উচিত নয়। শরীরের শক্তি ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্য সহনশীলতা অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত।
৬. ডায়রিয়া কি ছোঁয়াচে?
সংক্রমণের কারণে হওয়া ডায়রিয়া একজন ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে ছড়াতে পারে। অপরিষ্কার হাত, দূষিত খাবার বা জল এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের মাধ্যমে জীবাণু ছড়াতে পারে। তাই সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া ও খাবার-জলের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
৭. ডায়রিয়া হলে কি ঘরে তৈরি খাবার খাওয়া যাবে?
হ্যাঁ। পরিষ্কারভাবে তৈরি, ভালোভাবে রান্না করা এবং সহজে হজম হয় এমন ঘরের খাবার খাওয়া যেতে পারে। খাবার একেবারে বন্ধ না করে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া ভালো।
৮. শিশুদের ডায়রিয়ায় জিংক কেন দেওয়া হয়?
শিশুদের তীব্র ডায়রিয়ায় ওআরএসের পাশাপাশি জিংক দেওয়া হলে ডায়রিয়ার স্থায়িত্ব ও তীব্রতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শিশুদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বয়সভেদে জিংক ব্যবহারের সুপারিশ করে। তাই শিশুকে জিংক দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
৯. ডায়রিয়া ভালো হওয়ার পরও কি দুর্বলতা থাকতে পারে?
হ্যাঁ। ডায়রিয়ার সময় শরীর থেকে জল ও বিভিন্ন লবণ বেরিয়ে যাওয়া এবং খাবার কম খাওয়ার কারণে কিছুদিন দুর্বলতা থাকতে পারে। পর্যাপ্ত তরল, ওআরএস এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করলে শরীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে।
১০. ডায়রিয়া বারবার হলে কী করা উচিত?
বারবার ডায়রিয়া হলে শুধু প্রতিবার ওষুধ খেয়ে যাওয়া উচিত নয়। এর পেছনে সংক্রমণ, খাদ্য অসহিষ্ণুতা, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অন্য কোনো সমস্যা রয়েছে কি না, তা জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
শেষ কথা
ডায়রিয়া সাধারণ সমস্যা হলেও অতিরিক্ত জল ও লবণ বেরিয়ে গেলে জলশূন্যতা তৈরি হতে পারে। তাই ডায়রিয়া হলে শুরু থেকেই শরীরে জল ও লবণের ঘাটতি পূরণের দিকে নজর দেওয়া, ওআরএস গ্রহণ করা এবং সহনশীলতা অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
পায়খানায় রক্ত, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, তীব্র দুর্বলতা বা জলশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়ার সময় অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র
- World Health Organization (WHO) – Diarrhoea
- World Health Organization (WHO) – Diarrhoeal Disease
- World Health Organization (WHO) – Zinc supplementation in the management of diarrhoea
দায়বদ্ধতা: এই আর্টিকেলে দেওয়া তথ্য শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য। এটি কোনো চিকিৎসকের বিকল্প নয়।
