কানে শোঁ শোঁ শব্দ বা টিনিটাস (Tinnitus): কারণ, লক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক নির্দেশিকা
কানের ভেতরে কোনো বাহ্যিক উৎস ছাড়াই অবিরত বা থেমে থেমে নিঝুম রাতে শোঁ শোঁ, সিটি, গুনগুন বা ঝিঁঝিঁ পোকার মতো শব্দ শোনা একটি অত্যন্ত পরিচিত কিন্তু উদ্বেগজনক শারীরিক সমস্যা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে টিনিটাস (Tinnitus) বলা হয়। এটি নিজে কোনো একক রোগ নয়, বরং কানের ভেতরের সূক্ষ্ম স্নায়ুকোষ বা স্নায়ুতন্ত্রের অন্য কোনো অভ্যন্তরীণ শারীরিক সমস্যার বহিঃপ্রকাশ বা লক্ষণ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ডেফনেস অ্যান্ড আদার কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডারস (NIDCD)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ১০% থেকে ২৫% কোনো না কোনো সময় টিনিটাসের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। একজন রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট হিসেবে ফার্মাকোলজিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলতে পারি, সঠিক মূল্যায়ন, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে টিনিটাসের কারণে সৃষ্ট অস্বস্তি কমানো এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব।
সংক্ষেপে জেনে নিন
- টিনিটাস কী: বাহ্যিক শব্দের উৎস ছাড়াই কান বা মাথার ভেতরে শব্দ অনুভব করা।
- মূল কারণসমূহ: অতিরিক্ত শব্দের সংস্পর্শ, বয়সবৃদ্ধিজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাস, কানের খোল বা ব্লকেজ এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের প্রভাব।
- ওষুধ ও ঝুঁকি: নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ কানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে; তবে তা নির্ভর করে মাত্রা, ব্যবহারকাল ও শারীরিক অবস্থার ওপর।
- ডায়াগনোসিস ও অ্যাসেসমেন্ট: অডিওমেট্রি, কানের শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনবোধে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ইমেজিং (MRI/CT Scan)।
- ব্যবস্থাপনা: কারণভিত্তিক চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, সিবিটি (CBT), সাউন্ড থেরাপি এবং হিয়ারিং এইড।
- প্রতিরোধমূলক অভ্যাস: উচ্চ শব্দ এড়ানো, শ্রবণের সুরক্ষা নেওয়া এবং ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের-এর মাধ্যমে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা।
টিনিটাস বা কানে শব্দ হওয়া কী?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো প্রকার বাহ্যিক শব্দ-তরঙ্গ ব্যতিরেকে কানের ভেতরে বা মাথার অভ্যন্তরে শব্দ শোনার অনুভূতিকে টিনিটাস বলে। এটি এক কানে, দুই কানে বা পুরো মাথার ভেতরে অনুভূত হতে পারে। এই শব্দ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে—যেমন উচ্চমাত্রার বাঁশির শব্দ (Ringing), শোঁ শোঁ শব্দ (Hissing), বাতাসের গর্জন (Roaring), ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক (Buzzing) কিংবা স্পন্দনের শব্দ (Pulsatile)।
টিনিটাস মূলত দুই প্রকারের হয়ে থাকে:
- সাবজেক্টিভ টিনিটাস (Subjective Tinnitus): এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরণ। এই ক্ষেত্রে কেবল রোগী নিজেই শব্দ শুনতে পান, বাইরের কেউ বা চিকিৎসক পরীক্ষা করে শব্দ পান না।
- অবজেক্টিভ টিনিটাস (Objective Tinnitus): এটি তুলনামূলক বিরল প্রকৃতির। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক স্ট্রেথোস্কোপ বা বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে রোগীর কানের কাছ থেকে শব্দ শুনতে পেতে পারেন। এটি সাধারণত রক্তনালীর সমস্যা বা পেশির সংকোচনের কারণে ঘটে থাকে।
কানে শোঁ শোঁ শব্দ হওয়ার সম্ভাব্য কারণসমূহ
টিনিটাস ঘটার পেছনে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ও পরিবেশগত কারণ থাকতে পারে। নিম্নে প্রধান কয়েকটি কারণ আলোচনা করা হলো:
১. অতিরিক্ত শব্দের সংস্পর্শ (Noise-Induced Hearing Loss)
দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত জোরে গান শোনা, কারখানা বা ভারী যন্ত্রপাতির শব্দে কাজ করা, কিংবা কোনো হঠাৎ তীব্র শব্দ কানের ভেতরের কক্লিয়াতে থাকা সূক্ষ্ম চুল সদৃশ কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে টিনিটাসের সৃষ্টি করতে পারে।
২. বয়সজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাস (Presbycusis)
বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের শ্রবণযন্ত্রের কোষগুলো দুর্বল হতে থাকে। সাধারণত প্রবীণ ব্যক্তিদের মধ্যে শ্রবণশক্তি কমার সাথে সাথে টিনিটাস বেশি দেখা যায়।
৩. কানের খোল বা ইউস্টেশিয়ান টিউবের সমস্যা
কানের মোম জমে শ্রবণনালী আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া এবং টিনিটাসের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। একইভাবে, কানের সংক্রমণ বা ইউস্টেশিয়ান টিউবের কার্যকারিতার সমস্যার কারণেও কানে শব্দ, চাপ বা বন্ধভাব অনুভূত হতে পারে। সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কানের মধ্যে অস্বস্তি বা শব্দ হলে কোনো কাঠি বা বাড দিয়ে খোঁচাখুঁচি করবেন না। সঠিক পরীক্ষা ও মূল কারণ নির্ণয়ের জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ওষুধ ও অটোটক্সিসিটি: ফার্মাকোলজিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি
কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে টিনিটাস বা শ্রবণশক্তির সমস্যা দেখা দিতে পারে। ঝুঁকি নির্ভর করে ওষুধের ধরন, মাত্রা, ব্যবহারের সময়কাল এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর।
- NSAIDs ও অ্যাসপিরিন: উচ্চ মাত্রায় অ্যাসপিরিন এবং কিছু NSAID, যেমন আইবুপ্রোফেন, টিনিটাসের কারণ হতে পারে।
- অ্যামিনোগ্লাইকোসাইড অ্যান্টিবায়োটিক: জেন্টামাইসিন ও অ্যামিকাসিনের মতো ওষুধ শ্রবণশক্তির ক্ষতি করতে পারে।
- লুপ ডাইইউরেটিক্স: ফুরোসেমাইডের মতো ওষুধ, বিশেষত নির্দিষ্ট উচ্চ-ঝুঁকির পরিস্থিতিতে, কানের ওপর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে।
- কেমোথেরাপির ওষুধ: সিসপ্ল্যাটিনের মতো কিছু ওষুধ শ্রবণশক্তির ক্ষতি করতে পারে।
- কুইনাইন: এই ওষুধের ব্যবহারের সঙ্গেও টিনিটাসের সম্পর্ক রয়েছে।
কোনো ওষুধের কারণে টিনিটাস হচ্ছে বলে সন্দেহ হলে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ বা ডোজ পরিবর্তন করবেন না। প্রেসক্রাইবকারী চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।
কানে শোঁ শোঁ শব্দ নির্ণয় ও পরীক্ষা (Diagnosis & Imaging)
টিনিটাস নির্ণয়ে এবং এর সম্ভাব্য কারণ খুঁজে বের করতে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ (ENT Specialist) ও অডিওলজিস্টগণ কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন:
- অডিওমেট্রি পরীক্ষা: শ্রবণশক্তির মাত্রা এবং বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে শোনার ক্ষমতা পরিমাপ করা হয়।
- টাইম্পানোমেট্রি: কানের পর্দার স্থিতিস্থাপকতা এবং মধ্যকর্ণের বায়ুর চাপ পরীক্ষা করা হয়।
- ইমেজিং টেস্ট (MRI বা CT Scan): সব টিনিটাস রোগীর ইমেজিং পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। কানের শব্দের ধরন, শারীরিক পরীক্ষার ফলাফল এবং অন্যান্য উপসর্গের ভিত্তিতে চিকিৎসক প্রয়োজনে MRI বা CT Scan করার পরামর্শ দিতে পারেন। বিশেষত হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শব্দ হওয়া বা একপাশে টিনিটাসের ক্ষেত্রে কারণ নির্ণয়ের জন্য আরও মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
টিনিটাসের বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি
টিনিটাসের চিকিৎসা এর সম্ভাব্য কারণ, শ্রবণশক্তির অবস্থা এবং দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাবের ওপর নির্ভর করে। কিছু ক্ষেত্রে মূল কারণের চিকিৎসায় উপসর্গ কমতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি টিনিটাসের ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং, কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT), উপযুক্ত সাউন্ড থেরাপি এবং শ্রবণশক্তি কমে গেলে হিয়ারিং এইড ব্যবস্থাপনার অংশ হতে পারে। তবে সব পদ্ধতি সবার ক্ষেত্রে সমান কার্যকর নয়।
রাতের নীরবতায় কানের শব্দ বেশি অনুভূত হতে পারে। ঘুমানোর সময় শান্ত ও মৃদু কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড শব্দ (যেমন টেবিল ফ্যান বা মৃদু সাউন্ড থেরাপি) ব্যবহার করলে মনোযোগ অন্যদিকে সরাতে সুবিধা হতে পারে।
প্রতিরোধ ও দৈনন্দিন জীবনের করণীয়
জীবনযাত্রায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন ও সচেতনতা অনুসরণের মাধ্যমে টিনিটাসের তীব্রতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। দৈনন্দিন জীবনে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি:
- উচ্চ শব্দযুক্ত পরিবেশে উপযুক্ত শ্রবণ-সুরক্ষা ব্যবহার করুন এবং দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
- হেডফোনে গান শোনার সময় ভলিউম কম রাখুন, নিয়মিত বিরতি নিন এবং দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দে শোনা এড়িয়ে চলুন।
- নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন এবং পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দিন।
- ক্যাফেইন, অ্যালকোহল বা নির্দিষ্ট খাবারের সঙ্গে টিনিটাসের তীব্রতার সম্পর্ক আছে কি না, তা ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্য করুন। কোনো নির্দিষ্ট উপাদান উপসর্গ বাড়ালে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেটি সীমিত করুন।
বাজারে অলৌকিক বা রাতারাতি টিনিটাস নিরাময়ের দাবি করে বিক্রি হওয়া ড্রপ বা ভেষজ সামগ্রী থেকে সতর্ক থাকুন। চিকিৎসা-সংক্রান্ত যেকোনো পদক্ষেপে অনুমোদিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
- জরুরি চিকিৎসা (একই দিনে): হঠাৎ করে শ্রবণশক্তি কমে গেলে বা কানের শব্দের ধরণ হঠাৎ বদলে গেলে কালবিলম্ব না করে চিকিৎসা নিন।
- জরুরি নিউরোলজিক্যাল লক্ষণ: কানের শব্দ বা ঝিঁঝিঁ শব্দের পাশাপাশি মুখের একপাশ অবশ বা দুর্বল লাগলে, কথা জড়িয়ে গেলে কিংবা হঠাৎ গুরুতর ভারসাম্যহীনতা দেখা দিলে দ্রুত জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করুন।
- পালসেটাইল টিনিটাস (হৃদস্পন্দনের মতো শব্দ): যদি কানে নিজের হৃদস্পন্দন বা রক্ত চলাচলের মতো তালে তালে শব্দ অনুভূতি হয়, তবে দ্রুত নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
- সাধারণ ডায়াগনস্টিক মূল্যায়ন: শুধুমাত্র এক কানে দীর্ঘস্থায়ী শব্দ, কানের ভেতর ব্যথা, তরল নির্গমন বা শ্রবণশক্তি ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
- মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার প্রভাব: টিনিটাসের কারণে তীব্র উদ্বেগ, বিষণ্নতা, মনোযোগের অভাব বা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিন।
টিনিটাস: মিথ বনাম সত্য (Myth vs Fact)
টিনিটাস একটি মরণব্যাধি এবং এটি খুব দ্রুত মানুষকে সম্পূর্ণ বধির করে দেয়।
টিনিটাস নিজে কোনো রোগ নয়; এটি একটি লক্ষণ মাত্র। সঠিক মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই শ্রবণশক্তির পরিবর্তন হলে পরীক্ষা করানো উচিত।
Cotton bud (কটন বাড বা ইয়ার বাড) দিয়ে কান নিয়মিত খোঁচালেই কানে শব্দ হওয়া বন্ধ হয়।
Cotton bud ব্যবহার করলে কানের মোম (Earwax) বাইরে আসার বদলে আরও গভীরে আটকে যেতে পারে। এছাড়া কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা উল্টো টিনিটাসের তীব্রতা বাড়াতে পারে।
নির্দিষ্ট কোনো জাদুকরী ড্রপ বা ওষুধ খেলেই টিনিটাস পুরোপুরি নিরাময় হয়ে যায়।
সব ক্ষেত্রে টিনিটাস রাতারাতি নিরাময় করার মতো কোনো একক নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। এটি মূল কারণের চিকিৎসা ও থেরাপিউটিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়।
টিনিটাস কেবল বয়স্কদেরই হয়।
টিনিটাস যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দে গান শোনা বা অন্যান্য কারণে তরুণদের মধ্যেও টিনিটাস দেখা যায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. টিনিটাস কি সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব?
টিনিটাসের মূল কারণ যদি সহজে নিরাময়যোগ্য কোনো সমস্যা হয় (যেমন—কানের খৈল জমে যাওয়া বা ইনফেকশন), তবে সেই কারণ দূর করলে টিনিটাস কমে যেতে পারে বা সম্পূর্ণ ভালো হতে পারে। তবে স্নায়বিক বা দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের ক্ষেত্রে চিকিৎসা মূলত লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করার ওপর কেন্দ্র করেই সাজানো হয়।
২. কানের ভেতর শোঁ শোঁ শব্দ হলে প্রাথমিক করণীয় কী?
আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকুন এবং উচ্চ শব্দ এড়িয়ে চলুন। উপসর্গটি দীর্ঘস্থায়ী হলে বা দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটালে অভিজ্ঞ নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞ বা অডিওলজিস্টের পরামর্শ নিন।
৩. হেডফোন ব্যবহারে কি কানে শোঁ শোঁ শব্দ বাড়তে পারে?
দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রায় হেডফোন ব্যবহার করলে শ্রবণশক্তির ক্ষতি হতে পারে, যা টিনিটাসের অন্যতম ঝুঁকি। ভলিউম সহনীয় পর্যায়ে রাখা ও বিরতি দেওয়া উচিত।
৪. টিনিটাসের কারণে কি ঘুমের সমস্যা হতে পারে?
হ্যাঁ, নীরব পরিবেশে শব্দ বেশি স্পষ্ট মনে হওয়ায় ঘুমে সমস্যা হতে পারে। ঘুমানোর রুটিন মেনে চলা এবং মৃদু ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড ব্যবহার করা এতে সহায়ক হতে পারে।
৫. খাদ্যাভ্যাসের সাথে কি কানের শব্দের কোনো সম্পর্ক আছে?
খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে টিনিটাসের সম্পর্ক ব্যক্তি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। কোনো খাবার বা পানীয়ের সঙ্গে উপসর্গের সম্পর্ক লক্ষ্য করলে তা নথিভুক্ত করুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৬. মানসিক চাপ কি টিনিটাস বাড়িয়ে দেয়?
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ শারীরিক অনুভূতিকে সংবেদনশীল করে তুলতে পারে, যার ফলে টিনিটাস বেশি বিরক্তিকর মনে হতে পারে। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের কৌশলগুলো এক্ষেত্রে সাহায্য করে।
৭. পালসেটাইল টিনিটাস কী এবং এটি কেন হয়?
কানের মধ্যে স্পন্দন বা হৃদস্পন্দনের ছন্দে শব্দ অনুভব করাকে পালসেটাইল টিনিটাস বলে। এটি রক্তনালীর অস্বাভাবিকতা বা রক্তপ্রবাহের পরিবর্তনের সংকেত হতে পারে, যার জন্য চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
৮. ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার কি টিনিটাস রোগীদের জন্য নিরাপদ?
উচ্চ শব্দযুক্ত পরিবেশে কান সুরক্ষায় ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাধারণ শান্ত পরিবেশে অপ্রয়োজনে এটি পরে থাকলে শব্দ আরও বেশি অনুভূত হতে পারে।
৯. ওষুধের প্রভাবে কানে শব্দ হলে কি ওষুধ সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া উচিত?
না, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্রেসক্রিপশনের ওষুধ বন্ধ করবেন না বা ডোজ পরিবর্তন করবেন না। ওষুধের সঙ্গে টিনিটাসের সম্পর্ক আছে কি না, তা চিকিৎসক মূল্যায়ন করতে পারেন এবং প্রয়োজনে ডোজ বা বিকল্প চিকিৎসা বিবেচনা করতে পারেন।
১০. জিংক বা জিঙ্কগো বিলোবা (Ginkgo Biloba) সাপ্লিমেন্ট কি টিনিটাস নিরাময় করতে পারে?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় জিংক বা জিঙ্কগো বিলোবা সবার ক্ষেত্রে কার্যকর বলে যথেষ্ট প্রমাণ মেলেনি। যেকোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পূর্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
শেষ কথা
কানে শোঁ শোঁ শব্দ বা টিনিটাস কোনো অবহেলা করার বিষয় নয়, আবার এটি নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়ারও কারণ নেই। জীবনের নানা ব্যস্ততা ও পরিবেশগত শব্দের মাঝে কানের স্বাস্থ্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। কানে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ বা অস্বস্তি অনুভব করলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মূল কারণটি সনাক্ত করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সঠিক স্বাস্থ্য সচেতনতা, শব্দদূষণ এড়িয়ে চলা এবং সময়োপযোগী বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই টিনিটাসের অস্বস্তি কাটিয়ে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত জীবন বজায় রাখা সম্ভব।
তথ্যসূত্র (References):
- National Institute on Deafness and Other Communication Disorders (NIDCD): Tinnitus
- National Institute for Health and Care Excellence (NICE): Tinnitus: assessment and management (NG155)
- NHS: Tinnitus
- Mayo Clinic: Tinnitus — Symptoms and causes
দায়বদ্ধতা (Disclaimer): এই নিবন্ধে উল্লেখিত তথ্যসমূহ কেবল সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। এটি কোনো পেশাদার চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। কানের যেকোনো জটিলতা, নতুন কোনো লক্ষণ বা ওষুধ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সর্বদা একজন নিবন্ধিত রেজিস্টার্ড চিকিৎসক বা নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞের প্রত্যক্ষ পরামর্শ নিন।
